১. সেন্ট মার্টিন ফোকাসড পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ গাইড
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পরিবেশগত এলাকা (Ecologically Critical Area)। পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে এই দ্বীপে বর্তমানে রাত্রিযাপন ও পর্যটক সংখ্যার ওপর সরকারি নানা কড়াকড়ি ও নিয়মনীতি আরোপ করা হয়েছে। সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণের সময় আমাদের মনে রাখতে হবে—আমাদের সামান্য অসচেতনতা এই দ্বীপের প্রবাল এবং জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিতে পারে।


প্লাস্টিক ও বর্জ্য সংক্রান্ত কঠোর আইন
দ্বীপে কোনো ধরনের ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক (প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন ব্যাগ) নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ পরিহার করুন। পর্যটকদের ফেলে আসা অপচনশীল প্লাস্টিক সাগরের বিপন্ন কচ্ছপ, রঙিন মাছ এবং প্রবালের শ্বাসরোধ ও মৃত্যুর প্রধান কারণ। নিজস্ব রিইউজেবল বোতল ব্যবহার করুন এবং সমস্ত অপচনশীল বর্জ্য পুনরায় মূল ভূখণ্ডে ফেরত নিয়ে আসুন।
সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সচেতন ব্যবহার
প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের ভূগর্ভস্থ মিষ্টি পানির স্তর অত্যন্ত সীমিত। অতিরিক্ত মিষ্টি পানি তুললে সমুদ্রের লোনা পানি ঢুকে পুরো দ্বীপের পানির উৎস নষ্ট হতে পারে। তাই গোসল ও ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন। একইসাথে দ্বীপে সার্বক্ষণিক জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ নেই—জেনারেটর বা সোলার বিদ্যুতের অপচয় রোধে সচেতন থাকুন।
ছেঁড়াদ্বীপ ও প্রবাল প্রাচীর রক্ষা
ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়ার সময় কোনো প্রবাল পাথর ভাঙবেন না, জুতো দিয়ে পিষ্ট করবেন না বা স্মারক হিসেবে সাথে করে নিয়ে আসবেন না। জীবন্ত প্রবাল এক একটি অমূল্য প্রাণী। তাছাড়া সৈকতের বিরল সামুদ্রিক জীব যেমন রাজকাঁকড়া এবং অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিম পাড়ার এলাকায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে না।
শব্দ ও তীব্র আলো দূষণ পরিহার
দ্বীপে উচ্চশব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজানো, মাইকিং বা মধ্যরাতে বারবিকিউ পার্টির নামে তীব্র ফ্লাডলাইট ছড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেন্ট মার্টিনের সৈকত নিশাচর প্রাণী, কাঁকড়া এবং সাগরের কচ্ছপদের রাতের আঁধারে ডিম পাড়ার স্থান। তীব্র আলো ও শব্দ তাদের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
সবুজ আবাসন নির্বাচন: সেন্ট মার্টিনের উল্লেখযোগ্য ইকো-রিসোর্ট
দ্বীপে থাকার জন্য কংক্রিটের ভারী স্থাপনা এড়িয়ে পরিবেশবান্ধব আর্কিটেকচার, সৌরবিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী টেকসই ইকো-রিসোর্ট বেছে নিন।
Music Eco Resort
কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ দিয়ার মাথায় অবস্থিত মিউজিক ইকো রিসোর্ট তাদের উদ্ভাবনী কন্টেইনার হোম ও টেকসই তাঁবু খাটিয়ে থাকার চমৎকার পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা রেখেছে, যা কোনো স্থায়ী কংক্রিট ক্ষতি ছাড়াই প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে মানানসই।
Beach Valley Eco Resort
সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম বিচের মনোরম বালুকাবেলায় অবস্থিত এই রিসোর্টটি প্রবালমুক্ত বালুকাময় সৈকত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করে। তাদের ওপেন কটেজ ও কাঠ-বাঁশের নান্দনিক ডিজাইন উপকূলের হালকা বাতাসকে কাজে লাগিয়ে শক্তি সাশ্রয় নিশ্চিত করে।
Kingshuk Eco Resort
কিংশুক ইকো রিসোর্ট পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়। স্থানীয় কাঠ ও প্রাকৃতিক সামগ্রী দিয়ে নির্মিত তাদের কটেজগুলো পর্যটকদের দেয় শহরের কোলাহলমুক্ত শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ।

ভ্রোমোনবিলাসের সবুজ অঙ্গীকার
“আমরা বিশ্বাস করি ভ্রমণ কেবল দেখার জন্য নয়, ভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন সচেতন পর্যটকের প্রকৃত সার্থকতা। ভ্রোমোনবিলাস প্ল্যাটফর্মে আমরা পরিবেশবান্ধব অনুমোদিত রিসোর্ট ও টেকসই পরিবহনকে উৎসাহিত করি।”
সবুজ ইকো রিসোর্ট খুঁজুন২. টেকসই ভ্রমণ: সারা বাংলাদেশ টার্গেট গাইড
বাংলাদেশের অন্যান্য প্রান্তেও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জোয়ার শুরু হয়েছে। চা বাগানের শ্যামল ছায়া থেকে হাওরের স্বচ্ছ জল, ম্যানগ্রোভ বনানী থেকে উঁচু পাহাড়ের চূড়া—ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের জন্য পরিবেশ সুরক্ষার গাইডলাইনসমূহ:


১. সিলেট ও শ্রীমঙ্গল (চা বাগান ও বনাঞ্চল)
ইকো-ট্যুরিজম ও ট্র্যাকিং: শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বা রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ট্র্যাকিংয়ের সময় বনের নীরবতা বজায় রাখুন। বন্যপ্রাণীদের উচ্চশব্দে ভয় দেখাবেন না বা প্লাস্টিকের বোতল ফেলে আসবেন না।
কোথায় থাকবেন: শ্রীমঙ্গলে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার জন্য Nirjon Nature's Hideout এর মতো শান্ত ও ইকো-বান্ধব রিসোর্টগুলো বেশ জনপ্রিয়, যা আপনাকে শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে নিখাদ সতেজতা দেবে।
২. সুনামগঞ্জ (টাঙ্গুয়ার হাওর)
রামসার সাইট ও হাওর রক্ষা: টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন রামসার সাইট (Ramsar Site) এবং পরিযায়ী পাখির প্রধান আশ্রয়স্থল। এখানে ভ্রমণের সময় স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর ১৩-দফা পরিবেশ সংক্রান্ত নির্দেশনা বলবৎ রয়েছে।
সৌরচালিত হাউসবোট ভ্রমণ: হাওরে চলাচলের জন্য প্রশাসন অনুমোদিত ও পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ চালিত হাউসবোট ব্যবহার করুন। বোটে লাউডস্পিকার বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রান্নার বর্জ্য, প্লাস্টিক বা কোনো তরল কেমিক্যাল কোনোভাবেই হাওরের স্বচ্ছ পানিতে ফেলা যাবে না।
৩. সুন্দরবন (বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন)
নীরব নেভিগেশন ও ক্যানেল ক্রুজিং: সুন্দরবনের ছোট ছোট খালে যখন ঘুরবেন, তখন তীব্র শব্দযুক্ত ইঞ্জিনের নৌকা পরিহার করে নীরব কাঠের দাঁড়ের নৌকা ব্যবহার করুন। বনের শান্ত পরিবেশ জীবজন্তুকে স্বাভাবিক চলাচলে সহায়তা করে।
বন্যপ্রাণী দর্শন বিধি: বনের ভেতরে চিত্রা হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিললে কোনো চিৎকার বা হাততালি দেবেন না। সর্বদা ন্যূনতম ৫০ মিটার নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন এবং সশস্ত্র বনরক্ষীর নির্দেশনা মেনে চলুন।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি)
কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম (CBT): পাহাড়ে ভ্রমণের সময় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাড়ায় (যেমন বম, চাকমা, মারমা বা ম্রো পাড়া) হোমস্টে সুবিধা গ্রহণ করুন। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রথা ও জীবনযাত্রার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন।
স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখা: কোনো কর্পোরেট ব্র্যান্ডের পরিবর্তে স্থানীয়দের তৈরি ঐতিহ্যবাহী তাঁতবস্ত্র, হাতে বোনা ঝুড়ি ও স্থানীয় খাবার কিনে তাদের পরিবার ও অর্থনীতি সচল রাখতে সাহায্য করুন।

৫. কক্সবাজার ও উপকূলীয় পরিচ্ছন্নতা
বিশ্বের দীর্ঘতম ১২০ কিমি প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র সৈকত আমাদের জাতীয় অহংকার। সৈকতে বিচ বাইক চালানো বা সামুদ্রিক লাল কাঁকড়ার বিচরণের জায়গায় ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ পরিহার করুন। ইনানী ও হিমছড়ি অঞ্চলে প্রবাল পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গিয়ে পাথর ভাঙা থেকে বিরত থাকুন।
৩. গ্রিন ট্রাভেলারদের জন্য গোল্ডেন রুলস
একজন সত্যিকারের দায়িত্বশীল পর্যটক সবসময় প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে চলে। নিচের সুবর্ণ নিয়মগুলো মেনে চললে আপনার প্রতিটি ভ্রমণ হবে অর্থপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব:
স্থানীয় ইকো-গাইড নিয়োগ
যেকোনো নতুন স্পটে ঘুরতে গেলে সবসময় স্থানীয় গাইড নিয়োগ করুন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং তারা বনের ও পরিবেশের সুরক্ষায় আরও আন্তরিক ও যত্নশীল ভূমিকা পালন করে।
কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমান
কাছাকাছি দূরত্বের জন্য ইঞ্জিনচালিত গাড়ি পরিহার করে হেঁটে চলুন বা সাইকেল ব্যবহার করুন। সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপে সাইকেলিং যেমন স্বাস্থ্যকর, তেমনি বাতাসে বিষাক্ত কার্বন নির্গমন শূন্য রাখে।
Leave No Trace (কোনো চিহ্ন নয়)
“আপনি যেখানেই যান না কেন, স্পটটি যেন আপনার যাওয়ার আগের চেয়েও পরিষ্কার থাকে।” কোনো চিপসের খোসা, চায়ের কাপ বা সিগারেটের ফিল্টার ফেলে আসবেন না। সম্ভব হলে সৈকত বা ট্রেইলে পড়ে থাকা প্লাস্টিক কুড়িয়ে পরিচ্ছন্নতায় অংশ নিন।
জীববৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা
বন্যপ্রাণীদের খাবার দেওয়া, তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস করা বা সমুদ্রের জীবন্ত কোরাল ও শামুক ছোঁয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রকৃতিকে দূর থেকেই শ্রদ্ধা জানানো একজন প্রকৃত প্রেমিকের বৈশিষ্ট্য।


